মহসিন খান , আত্মহননের কথামালা।। শাহজালাল খান
- শাহজালাল খান

- Feb 4, 2022
- 4 min read
ব্যক্তির সরব না নীরব প্রতিবাদ থেকে যে আত্মহত্যা সংঘটিত হয় , তাতে স্রেফ আত্মহত্যার তকমা লাগানো ভুল । আত্মহত্যার অন্তর্নিহিত বার্তাগুলো সজিব প্রাণে স্পন্দিত না হলে সেটি নিছক একটি পতিত সমাজ । সমাজে যে কোন ভাবে, যে কোন মূল্যে ও যে কোন প্রকারে বেঁচে থাকার চিত্রটি অঙ্কিত হলে সেটি বিভৎস সমাজ হতে বাধ্য । মর্যাদা , নায্যতা, অধিকারের প্রাপ্যতা , স্নেহ – শ্রদ্ধা- ভালবাসা, শ্রম ও ত্যাগের প্রতিদান , বিবেকবোধ ও মানবতাবোধ নিয়ে বেঁচে থাকতে না পারলে মৃত্যুই শ্রেয়, এই কথাগুলো আমরাতো অহরহ বলে থাকি !
ফল বিক্রি করার অধিকার থেকে অপমানের গ্লানির প্রতিবাদে আত্মহুতি দিয়েছিল তিউনেশিয়ার সবজি বিক্রেতা বু আজিজি । আরব ভূমির পরিবর্তন বা ধ্বংশের মূল শিকড়টি সেই আত্মহুতি থেকে । তাই আত্মহত্যার যে সামাজিক কোন মূল্যই নেই , এই ভাবনাটিই অবান্তর ।
সামাজিক অবক্ষয়ের গ্লানি থেকে , পারিবারিক মর্যাদাহীনতার কদর্য থেকে আত্মহ্ত্যার কথা অহরহ আমাদের কানে বাজে , কিন্তু সেগুলোর বার্তাটি হৃদয়ে পৌঁছে না । শুনতেও পছন্দ করি না , বাচ-বিচারের আগ্রহও থাকে না । সরল প্রেম. অভিমানীর আত্মহত্যারও একটি চরম বার্তা থাকে । পড়তে ও বুঝতে না পারলে গৃহে বা সমাজে এর মর্মান্তিক পরিণতি বয়ে নিয়ে আসার আশঙ্কা ভর করে ।
সমাজের কেউ আত্মহত্যা করলে এখন কেউ আর তার বেদনাটি উপলব্ধি করে না বরং কোন কোন ক্ষেত্রে বিদ্রুপ করে , উপহাস করে কারণ আমাদের অনুভূতির গহ্বর গুলো স্বেচ্ছাচার , ছলা – কলা ও মেকিতে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে । পাশাপাশি কোভিট সামাজিক সম্পর্কগুলোকেও লন্ডভণ্ড করে মণ্ড বানিয়ে ছেড়েছে । পারিবারিক হৃদ্যিক সম্পর্কগুলো ফুলের নির্যাস না কষ , সুধা না বিষ , মোয়া না খোয়া , এখন সেটি বুঝার আর কোন উপায় নেই ।
মহামান্য হাইকোর্টের কাছে এই আবদারটি করা যেতে পারে যে, কেবল শিশু , বৃদ্ধ ও দুর্বল চিত্তের মানুষের কথা চিন্তা করে মহসিন খানের ট্রিগার টিপার দৃশ্যটি ডিলিট করে দেওয়া হোক । বাকিটুকু যদি রেখে দেওয়া হয় তবে আত্মহুতের এই আত্মকথনটি আমাদের নব্য সামাজিক কাঠামোর নব্য অসুখ নির্ণয়ের দাওয়া হিসেবে কাজ করতে পারে । সবুকিছু মুছতে গেলে সমাজের যন্ত্রণা থেকে উত্থিত মূল্যাতীত দীক্ষাগুলোও মুছে যায় ।
আবার না মুছলেও বিপদ । তাহলে বন্ধুত্বের প্রতি আমাদের কালোদৃষ্টি বর্ষিত হবে , সন্তানের প্রতি স্নেহমমতায় চিড় ধরবে , স্ত্রীদের একঘেয়ে স্বার্থ , একগুঁয়ে মাতৃত্ব. সংসারিক দাম্পত্যের দাঁড়িপাল্লা নিয়ে প্রশ্ন তুলে পাল্লার দণ্ডটি যত্রতত্র ভেঙে যেতে পারে । পাশাপাশি আত্মহুতের কথনটি রেখে দিলে কিছু উপকারও হতে পারে । টাকা দ্রুততর গতিতে দ্বিগুণ বা বহুগুণ করণ প্রকল্পে অন্ধ বিনিয়োগে মানুষের মানসিক রোগটিকেও সনাক্ত করা যেতে পারে । গ্রন্থগত বিদ্যা আর পরহস্তধনের অমূল্য কথনটিও আবার দৃশ্যপটে ফিরে আসতে পারে ।
মৃত্যুকে বরণ করার তথাকথিত দৃ্শ্যপট নিয়েও বিশ্লেষণ করার নতুন দৃষ্টিভঙ্গী তৈরি হতে পারে । যুদ্ধে নিশ্চিত মৃত্যু জেনে- শুনে- বুঝার পরও যে আত্মহুতি দেয় , আমাদের দৃষ্টিতে সেই বীর ও শহিদ । কারণ সে জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করেছে । স্বার্থ রক্ষা না করে জীবন ভালবেসে ফেললেই বিপদ ! যুদ্ধক্ষেত্রে কেবল নিজের জীবনকে বাঁচিয়ে ফেরা , সে তো বিশ্বাস ঘাতক ! জঘন্য !
পারিবারিক ও সামাজিক স্বার্থ এর দাবি পূরণ না করে নিজেকে ভালবেসে বাঁচবেন তাও নিন্দা , নিজেকে ঘৃণা করে মরবেন তাও ধিক্কার !
যে সৈনিকটিকে কাল প্রত্যুষে সেনাপতির আদেশে নারীর সম্ভ্রম হানি করতে হবে , শিশু হত্যা করতে হবে , নির্বিচারে ঘুমন্ত মানুষকে হত্যা করতে হবে , এই বিভীষিকা থেকে নিজের হাতকে কলঙ্কমুক্ত রাখতে সম্মুখে একটি মাত্র উপায় অবলম্বন করে যখন ব্যারাকে আত্মহত্যা করে , তখন তাকে বিষাদগ্রস্ত , জীবনযুদ্ধে পরাজিত সৈনিক বলে খুব সহজেই হিসেবের খাতায় নাম লেখা হয় । জীবনের চিঠিগুলোতে তার কোন নাম- দাম-নিশানা থাকে না ।
আর ধর্ষণে চ্যাস্পিয়নশীপ নিয়ে ফিরে আসা , বর্বর হত্যাকাণ্ডের নিখুঁত ভাবে হাতরাঙিয়ে , ব্যারাকে ফিরে যেয়ে গুনগুনিয়ে গান গেয়ে রাতের ভোজন সারা সৈনিকই বীরমাল্যে ভূষিত করা হয় । পরের দিন ব্যারাকে ফুলেল সম্বর্ধনাটিও জুটে যায় , ইতিহাসও তাকে বরণ করে নেয় । মানব সমাজে মানবিক পরাজয়ের কোন দাম নেই , অমানবিক জয়ের ভীষণ মূল্য ! কিছু মানুষ অমর্যাদার জীবন থেকে মর্যাদার স্বেচ্ছা মৃত্যু বরণ করে নিয়েছে , এটা ইতিহাসের পাতায় বড় মানুষের যেমন আছে , ক্ষুদ্র মানুষদের ক্ষেত্রেও এটা অহরহ ঘটছে ।
এই সমাজে যেন তেন ভাবে , কচ্ছপ হয়ে , ভেড়া হয়ে , কেন্ন -শুয়োপোকা, সরীসৃপ হয়ে, জ্বরা -গ্লানি মেখে বেঁচে থাকাটাই অনেক কিছু । কারণ বেঁচে থাকাটাই এখানে মহামূল্য । স্বেচ্ছায় মরে যেয়ে কোন লাভ আদতে নেই । কিন্তু স্বেচ্ছায় মৃত্যুগুলোও যে একটা বার্তা দিয়ে যায় , সেই বার্তাটি নিয়ে একেবারে না ভাবলে সমূহ বিপদ !
মহসিন খানের মৃত্যু কেবল প্রেমে ব্যর্থ অভিমান করে কোন টিনএজারের আত্মহত্যার মতো নয় , জীবনের পরতে পরতে গ্লানি মাখা জীবনকে অব্যাহতি দিয়ে যে আত্মহুতি, যে আত্মহুতি সামাজিক জীবনকে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দেয়, অনেক বিষয়কে সামনে নিয়ে আসে , সেটা স্রেফ আত্মহত্যার খাতায় নিবন্ধিত করা কি যায় আদতে !
মহসিন খানের আত্মাহুতি বোধ- বিবেকহীন একটি পরিবর্তিত নব্য সমাজকে ধিক্কার জানানোর আত্মহুতি । মনুষ্যত্বহীনতার গরলে মিশিয়ে দেওয়া মুখের মৃত্যু -ফেণা আর ভদ্রতার মুখোশী আবরণে লুকানো পাষণ্ডতার বর্মে আঘাত করে যাওয়া এক আত্মহুতি , এটি নিজের হৃদপিণ্ড বের করে এনে, স্বীয় পদপেষণে আত্মাকে পিষ্ঠ করে আত্মবীজ বের করে আনার একটি বিক্ষুব্ধ প্রয়াস ।
মহসিন খানের এই অমানবিক নিষ্ঠুর নিষিদ্ধ প্রয়াসে আমদের নব্য প্রজন্ম আত্মজদের – আত্মবীজ থেকে বিবেকের অঙ্কুরোদগম ঘটবে কী ! পোড়ো বাঙালির ঘরে হারিয়ে যাওয়া পিতৃত্ব , মাতৃত্ব , ভ্রাতৃত্ব , বন্ধুত্ব , দাম্পত্য ও জ্ঞাতিত্ব কি শুদ্ধতায় ফিরবে ?
নাকি তাঁর বিষয়টি আমাদের কাছে দায়ভারহীন দায়িত্ব ! কেউ বহন করবে না ! বহন করতে হবেও না ! কেবল ডাক্তারি বিদ্যার ভাষায় লোকটির ব্রেনে সেরেটোনিনের সমস্যা বলেই চালিয়ে দেওয়া যাবে !
ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২২
শুক্রবার , চিত্রার পাড় থেকে ।






Comments