top of page

জাতীয় হাসন উৎসব ২০২৫ উদযাপিত


মরমী সাধক হাসন রাজার ১৭১তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে হাসন রাজা ফাউন্ডেশন ও মাসিক বাঙলাকথা’র উদ্যোগে ২১ ডিসেম্বর ঢাকায় ‘জাতীয় হাসন উৎসব ২০২৫’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ উপলক্ষে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে আলোচান সভা ও হাসনসঙ্গীত সন্ধ্যার আয়োজন করা হয়।

আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সচিব ড. হাফিজ আহমেদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হাসন রাজার প্রপৌত্র, লেখক, গবেষক ও হাসন রাজা ওয়াকফ এস্টেটের মুতওয়াল্লি জনাব দেওয়ান সমশের রাজা চৌধুরী, কবি ও কথাসাহিত্যিক, বিভাগীয় প্রধান, ফিজিওলজি বিভাগ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ জনাব অধ্যাপক ডাঃ জালাল উদ্দীন চৌধুরী। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কপিরাইট অফিসের সাবেক নিবন্ধক জাফর রাজা চৌধুরী, সাবেক অতিরিক্ত সচিব কথাসাহিত্যিক আহমেদ ফরিদ, বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী সেলিম চৌধুরী, আইন ও বিচার-এর সম্পাদক এডভোকেট শফিকুর রহমান প্রমুখ। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন হাসন রাজা ফাউন্ডেশন ও বাঙলাকথার উপদেষ্টা, নজরুল গবেষক যুগ্মসচিব মোঃ জেহাদ উদ্দিন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন হাসন গবেষক, শিল্পী, হাসন রাজা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হাসন রাজার প্রপৌত্র জনাব সামারীন দেওয়ান। অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের সিনিয়র প্রোগ্রাম এডভাইজার ফারোহা সোহরাওয়ার্দী, ফরেন সার্ভিস একাডেমির মহাপরিচালক ইকবাল আহমেদ, বিশিষ্ট নজরুলসঙ্গীত শিল্পী ওস্তাদ ইয়াকুব আলী খান প্রমুখ। অনুষ্ঠানে ‘হাসন রাজা তুমি কে’ নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়।

সভায় মরমী সাধক হাসন রাজার জীবন ও দর্শনের উপর আলোচার পর গানে গানে হাসন রাজার জীবন-দর্শন তুলে ধরেন সামারীন দেওয়ান। তাঁকে সহযোগিতা করেন সঙ্গীতশিল্পী রাজিন শারাফি ও হৃদয়।

সঙ্গীত সন্ধ্যায় হাসন রাজার একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন সেলিম চৌধুরী, পল্লীগীতি সম্রাট আব্দুল আলীমের সুযোগ্য সন্তান আজগর আলীম, লাভলী দেব, রুমী আজনবী, রাজিন শারাফি, মুবিন আহমেদ, জয়ন্ত পাল জয় ও রেদোয়ান ইসলাম হৃদয়।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সরকারের সচিব ড. হাফিজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, মরমী সাধক হাসন রাজা একজন ক্ষণজন্মা মনীষী, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম দার্শনিকদের অন্যতম তিনি। তাঁর দর্শন মানবমুক্তির দর্শন। সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সাথে মানুষের গভীরতম সংযোগ সাধনের মাধ্যমে একটি আদর্শ সুন্দর মানবসমাজ গঠনের জন্য তিনি কাজ করে গেছেন। তিনি ছিলেন প্রজাবান্ধব একজন মানবিক জমিদার। প্রায় ৫ লক্ষ একরের বিশাল জমিদারীর দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করার পাশাপাশি মরমী সাধনায় তিনি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন তা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল।  আমরা তাঁর গর্বিত উত্তরাধিকার। মহান দার্শনিককে যথাযথভাবে চর্চা করা এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তাঁকে সঠিকভাবে তুলে ধরা আমাদের একান্ত অপরিহার্য দায়িত্ব। হাসন রাজা ফাউন্ডেশন ও মাসিক বাঙলাকথা এ দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসায় তিনি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। 

বিশেষ অতিথি অধ্যাপক ডাঃ জালাল উদ্দীন চৌধুরী বলেন, হাসন রাজা একজন সুফি সাধক ছিলেন। জমিদারের পরিচয় ছাপিয়ে কঠোর সাধনা ও সহজ-সরল জীবন যাপনের মাধ্যমে তিনি হয়ে ওঠেন আধ্যাত্মিক জগতের রাজা। তাঁর আদর্শ আমাদের সকলের জন্য অনুপ্রেরণা। তিনি বলেন, সিলেট বেতার কেন্দ্র উদ্বোধন হয়েছিল হাসন রাজার গান দিয়ে। তখন বেতারে হাসন রাজার গান শিরোনামে আলাদা করে তাঁর গান প্রচারিত হতো। তিনি হাসন রাজার সৃষ্টিকর্ম ও দর্শনের বহুল প্রচার কামনা করেন।

দেওয়ান সমশের রাজা চৌধুরী হাসন রাজার উপর জাতীয় হাসন উৎসব আয়োজনের জন্য হাসন রাজা ফাউন্ডেশন ও মাসিক বাঙলাকথার প্রতি হাসন রাজা পরিবারের পক্ষ থেকে বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, হাসন রাজার উপর আমাদের অনেক কাজ করতে হবে। এ বিষয়ে সকলকে এগিয়ে আসার জন্য তিনি উদাত্ত আহ্বান জানান।

সামারীন দেওয়ান বলেন, হাসন রাজার বিষয়ে কৌশলে অনেক ভুল ধারণা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এগুলোর মূলোৎপাটন করে সত্যিকারের হাসন রাজাকে সবার সামনে তুলে ধরতে হবে। তিনি বলেন, সুনামগঞ্জে সরকারীভাবে হাসন রাজা একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে একাডেমি থেকে হাসন রাজার নামটি বাদ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ফোকলোর ইনস্টিটিউট নেই। তিনি একটি হাসন রাজা ফোকলোর ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।   

মোঃ জেহাদ উদ্দিন বলেন, সত্যিকারের হাসন রাজা হলেন অন্যরকম উচ্চতার একজন সুমহান মরমি সাধক। ছোট বেলা থেকেই তিনি অত্যন্ত ধীর-স্থির ও সত্যানুসন্ধানী। অত্যন্ত প্রজাবৎসল একজন জমিদার ছিলেন তিনি। ৫ লক্ষ একরেরও বেশি এলাকার বিরাট জমিদার ছিলেন তিনি। কিন্তু অত্যন্ত অমায়িক ও সাধাসিধা চরিত্রের একজন মানুষ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তিনি প্রজাদের খাজনা মাফ করে দিতেন। এতে করে তাঁর জমিদারির একটি বড় অংশ ইংরেজরা নিলামে বিক্রি করে দেয়। এত বড় জমিদার হয়েও তিনি কোন ধরনের কোন বিলাসিতা করতেন না। ছোট্ট একটি কুঁড়ে ঘরে থাকতেন। লোকে জিজ্ঞেস করলে বলতেন, কি ঘর বানাইমু আমি শুন্যের মাজার!’ স্বাধীনচেতা মানুষ ছিলেন। পরাক্রমশালী ইংরেজদের সামনে বুক ফুলিয়ে বলতেন, ‘হাসন রাজা বাঙ্গালী’। প্রজাসাধারণের কল্যাণে যা করেছেন সেই সবের ইয়ত্ত্বা নেই। অগণিত দাতব্য ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছেন, কিন্তু কোথাও নিজের নাম ব্যবহার করেননি। সুনামগঞ্জের আজকের জুবিলী স্কুল তাঁর তৈরি। কিন্তু নিজের নাম দেননি। ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের সময় তিনি সারারাত আল্লাহর দরবারে সিজদায় পড়ে থাকতেন। কেঁদে কেঁদে বলতেন, প্রভু, আমার জীবন নিয়ে আমার প্রজাদের রক্ষা কর। এক হাজারে বেশি সঙ্গীত সৃষ্টি করেছেন তিনি। তাঁর এই সব সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা হলে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হবে যে, তিনি শুধু বাংলাদেশের নন, বরং গোটা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মরমি সাধকদের একজন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, হাসন রাজাকে বাংলা সিনেমা এবং বিভিন্ন লেখায় অত্যন্ত নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। জেহাদ বলেন, হাসন রাজা কেবল বাংলাদেশর নন, তিনি বিশ্বের সম্পদ। তাই বিকৃতির কবল থেকে হাসন রাজার জীবন ও দর্শনকে রক্ষা করে সত্যিকারের হাসন রাজাকে সবার কাছে তুলে ধরা আমাদের সকলের দায়িত্ব।

সেলিম চৌধুরী বলেন, হাসন রাজা সিনেমায় সত্যিকারের হাসন রাজাকে তুলে ধরা হয়নি। মমতাজ উদ্দিন আহমদের মতো একজনের স্ক্রিপ্ট এবং চাষী নজরুল ইসলামের মতো একজন পরিচালকের পরিচালনায় নির্মিত সিনেমায় হাসন রাজার বিষয়ে ভুল বার্তা আসাটা খুবই দুঃখজনক।

জাফর রাজা চৌধুরী বলেন, হাসন রাজাকে নিয়ে এখনও অনেক কাজ করার বাকি। তাঁর সহজ সরল জীবন ও মানবমুক্তির দর্শন আমাদের সকলের জন্য অনুকরণীয়। জাতীয় হাসন উৎসব আয়োজনের জন্য তিনি মোঃ জেহাদ উদ্দিনসহ হাসন রাজা ফাউন্ডেশন ও বাঙলাকথা কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানান।

আহমেদ ফরিদ বলেন, হাসন রাজার সঙ্গীত ও জীবনাদর্শ সকলকেই ভীষণভাবে আকৃষ্ট করে। তাঁকে অনুসরণের মধ্য দিয়ে একটি আদর্শ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন।

শফিকুর রহমান বলেন, হাসন রাজা সকলের সম্পদ। তাঁকে আমাদের সবাইকে নিবিড়ভাবে কাজ করতে হবে।

শিক্ষাবিদ, অভিনেতা ও পরিচালক আজিজুর রহমান মিন্টু আগামী ২১ ডিসেম্বরের মধ্যে সত্যিকারের হাসন রাজার উপর একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের ঘোষণা প্রদান করেন।



Comments


পাঠক নিবন্ধন ফর্ম​

জমা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ!

লেখা প্রদানের জন্য মেইল করুন

banglakotha2011@gmail.com

©2025 by Banglakotha

Bangladesh

bottom of page