top of page

বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী ও দার্শনিক আল বিরুনীর ৯৭৭তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ


"এলো কি আল বিরুনী হাফিজ খৈয়াম কায়েস গাজ্জালী"--নজরুল


আল বিরুনি ছিলেন মধ্যযুগের একজন বিশিষ্ট আরবীয় শিক্ষাবিদ ও গবেষক। তিনি অত্যন্ত মৌলিক এবং গভীর চিন্তাধারার অধিকারী ছিলেন। তাঁর প্রকৃত নাম আবু রায়হান মোহাম্মদ ইবনে আহমদ আল বিরুনি। সাধারণভাবে তিনি আল বিরুনি নামেই বেশি পরিচিত। 


তিনি গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, রসায়ন এবং প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন।

অধিকন্তু ভূগোলবিদ, ঐতিহাসিক, গণিতবিদ, দার্শনিক ও চিকিৎসা বিজ্ঞান, ভাষাতত্ত্ববিদ ও ধর্মতত্ত্বের নিরপেক্ষ বিশ্লেষক তিনি। স্বাধীন চিন্তাধারা, মুক্তবুদ্ধি, সাহসিকতা, নির্ভীক সমালোচনা এবং সঠিক মতামতের জন্য তিনি যুগশ্রেষ্ঠ বলে স্বীকৃত।


অধ্যাপক মাপা বলেন, আল বিরুনি শুধু মুসলিম বিশ্বেরই নন, বরং তিনি ছিলেন সমগ্র বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানীদের একজন।


আবু রায়হান আল বিরুনি ইরানের একটি অতি সাধারণ পরিবারে ৯৭৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। জীবনের প্রথম ২৫ বছর আবু রায়হান আল বিরুনি স্বীয় জন্মভূমিতে অতিবাহিত করেন। তিনি গণিত শাস্ত্রবিদ আবু নাসের ইবনে আলী ইবনে ইরাক জিলানি এবং আরও কিছু বিদ্বান ব্যক্তির কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। অধ্যয়নকালেই তিনি তাঁর কিছু প্রাথমিক রচনা প্রকাশ করেন এবং প্রখ্যাত দার্শনিক এবং চিকিৎসাশাস্ত্রজ্ঞ ইবনে সিনার সঙ্গে পত্রবিনিময় করেন। আল বিরুনির মাতৃভাষা ছিল খাওয়ারিজিম, যা ছিল আঞ্চলিক ইরানি ভাষা। কিন্তু তিনি তাঁর রচনাবলি আরবিতে লিখে গেছেন। আরবি ভাষায় তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। তিনি আরবিতে কিছু কবিতাও রচনা করেন। অবশ্য শেষের দিকে কিছু গ্রন্থ ফার্সিতে অথবা আরবি এবং ফার্সি উভয় ভাষাতেই রচনা করেন। তিনি গ্রিক ভাষাও জানতেন। হিব্রু ও সিরীয় ভাষাতেও তাঁর জ্ঞান ছিল অসীম।


তিনি ১০০৮ সালে নিজ দেশে ফিরে এলে শাহ আবুল হাসান আলী ইবনে মামুন তাঁকে সসম্মানে গ্রহণ করেন। আলী ইবনে মামুনের ইন্তেকালের পর আল বিরুনি তাঁর ভাইয়ের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন এবং অনেক নাজুক রাজনৈতিক কার্যকলাপ ছাড়াও রাজকীয় কাজের দায়িত্বেও নিয়োজিত থাকেন। মামুন তাঁর সৈন্যবাহিনীর হাতে ১০১৬ থেকে ১০১৭ সালের ভিতর নিহত হওয়ার পর সুলতান মাহমুদ খাওয়ারিজম দখল করে নেন। বিরুনি তখন গণিতবিদ আবু নাসের মানসুর ইবনে আলী এবং চিকিৎসক আবুল খায়ের আল-হুসায়ন ইবনে আল-খাম্মার আল-বাগদাদির সঙ্গে গজনি চলে যান।


গজনিতেই তাঁর জ্ঞানচর্চার স্বর্ণযুগের সূচনা হয়। তখন থেকে তিনি গজনি শাহি দরবারে রাজ জ্যোতির্বিদ হিসেবে অবস্থান করতে থাকেন। তিনি কয়েকবার সুলতান মাহমুদের সঙ্গে উত্তর-পশ্চিম ভারত সফর করেন। গজনির সুলতানের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি ভারতে প্রায় ১২ বছর অবস্থান করেন। এখানে সংস্কৃত ভাষা শেখেন এবং হিন্দু ধর্ম, ভারতীয় সভ্যতা এবং সংস্কৃতি, দেশাচার, সামাজিক প্রথা, রীতিনীতি, কুসংস্কার ইত্যাদি বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। তিনি ভারতীয় কিছু আঞ্চলিক ভাষাও শিখেছিলেন। তিনি সেই এক যুগের অধ্যায় ও অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান দিয়ে রচনা করেন তাঁর বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ কিতাবুল তারিখ-আল-হিন্দ।


ইউরোপীয় পণ্ডিতদের মতে, আল বিরুনি ছিলেন স্বয়ং বিশ্বকোষ এবং তাঁর প্রত্যেকটি গ্রন্থ ছিল জ্ঞানের আধার। ভারতীয় পণ্ডিতরা আল বিরুনিকে জ্ঞানের সমুদ্র বলতেন। ভারত সম্পর্কে তার পাণ্ডিত্যপূর্ণ বস্তুনিষ্ঠতা তাঁকে আল-ওস্তাদ (‘দ্য মাস্টার’) উপাধিতে সম্মানিত করেছিল।


আল বিরুনির ভারত থেকে গজনি প্রত্যাবর্তন করার কিছু দিন পর সুলতান মাহমুদ ইন্তেকাল করেন। এরপর পুত্র সুলতান মাসউদ ১০৩০ সালে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি ১০৩০ থেকে ১০৪১ সাল পর্যন্ত সিংহাসনে ছিলেন। সুলতান মাসউদ আল বিরুনিকে খুব সম্মান করতেন। আল বিরুনি তাঁর অনুরক্ত হয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থের নাম সুলতানের নামানুসারে রাখেন, কানুন মাসুউদি এবং তা সুলতানের নামে উৎসর্গ করেন। সুবিশাল গ্রন্থখানা ১১ খণ্ডে সমাপ্ত। গ্রন্থটির গুরুত্ব উপলব্ধি করে সুলতান মাসউদ অত্যন্ত খুশি হয়ে একটি হাতির ওজনের সমপরিমাণ রৌপ্য আল বিরুনিকে উপহার দেন। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ না করে বাহ্যিক সন্তোষ প্রকাশ করে সব রৌপ্যই রাজকোষে ফিরিয়ে দেন। মন্তব্য করেন, তাঁর এত ধনসম্পদের কোনো প্রয়োজন নেই।


আল বিরুনির সর্বমোট ১১৩টি গ্রন্থের উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে ১০৩টি গ্রন্থ সম্পূর্ণ এবং ১০টি অসম্পূর্ণ। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য থেকে প্রতীয়মান হয়, তাঁর রচিত গ্রন্থের সর্বমোট সংখ্যা ১৮০টি। এগুলো তথ্য, তত্ত্ব ও পরিসরের দিক থেকে বিভিন্ন। কোনোটি পুস্তক, কোনোটি গবেষণামূলক সন্দর্ভ আবার কোনোটি বৃহদাকার গ্রন্থ, যাতে জ্ঞানের বিশাল ভান্ডার বিধৃত ধারণ করা হয়েছে।


প্রখ্যাত দার্শনিক ও চিকিৎসাশাস্ত্রজ্ঞ ইবনে সিনার (৯৮০-১০৩৭) সঙ্গে নিয়মিত আল বিরুনি পত্রবিনিময় করতেন। তিনি ১০০৮ খ্রিস্টাব্দে নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। ১০৪৮ সালের ১৩ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়।


আল বিরুনীসহ বিশ্ববিশ্রুত মুসলিম মনীষীদের স্মরণ করেছেন কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর বহু সৃষ্টিতে। এমনি একটি অপার্থিব সৃষ্টি এই লিংক থেকে দেখে নেয়া যেতে পারে:

Comments


পাঠক নিবন্ধন ফর্ম​

জমা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ!

লেখা প্রদানের জন্য মেইল করুন

banglakotha2011@gmail.com

©2025 by Banglakotha

Bangladesh

bottom of page