সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীর ৯০ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি
- মো জেহাদ উদ্দিন

- Jul 17, 2021
- 3 min read

আজ ১৭ জুলাই ২০২১ অনলবর্ষী বক্তা, শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি, কবি ইসমাইল হোসেন সিরাজীর ৯০তম মৃত্যুবার্ষিকী। মাসিক বাঙলাকথা পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।
তাঁর সম্পর্কে বাংলাপিডিয়া ও সিরাজগঞ্জ জেলার সরকারী ওয়েবসাইটে লেখা হয়েছেঃ
‘সিরাজগঞ্জের বিশিষ্ট লেখক, বাগ্মী এবং কৃষক নেতা। তিনি সিরাজগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন (এ কারণেই তিনি তাঁর নামের সঙ্গে ‘সিরাজী’ উপাধি যুক্ত করেন)। পিতা আব্দুল করিম খন্দকার (১৮৫৬-১৯২৪) ইউনানী (ভেষজ ঔষধ) চিকিৎসক ছিলেন। আর্থিকভাবে তিনি তেমন স্বছল ছিলেন না। তাই যথেষ্ট মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও সিরাজীর কলেজে পড়া সম্ভব হয়নি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করতে না পারলেও তিনি মেধা চর্চা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি। সিরাজী লেখালেখি করে এবং সভা সমিতিতে বক্তৃতা করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তাঁর লেখা ও বক্তৃতার প্রধান বিষয়বস্তু ছিল বাংলার অনগ্রসর মুসলিম সমাজকে জাগিয়ে তোলা। বাগ্মী হিসেবে তিনি যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছিলেন। মুসলমানদের স্বার্থের কথা বললেও তিনি সাম্প্রদায়িক ছিলেন না। তিনি মনে করতেন, সম্পদের সুসম বন্টনের মধেই হিন্দু-মুসলমানের সৌহার্দ্য নির্ভর করছে। ইসমাইল হোসেন সিরাজী একই সাথে বেশ কিছু সংগঠন ও দলের সদস্য ছিলেন, যেমন অল ইন্ডিয়া ন্যাশনাল কংগ্রেস, জামিয়ত-ই-উলামা-ই-হিন্দ, স্বরাজ পার্টি ও কৃষক সমিতি। শিবলী নোমানী (১৮৫৭-১৯১৪) ও মুহম্মদ ইকবালের (১৮৭৬-১৯৩৮) প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছিল সিরাজীর ওপর। তাঁদের মতো তিনিও অনুভব করেছিলেন যে ধর্মীয় ও সেক্যুলার চিন্তার মধ্যে সমন্বয় সাধন করে একদিকে যেমন ভারতীয় মুসলমান সম্প্রদায়কে জাগিয়ে তোলা সম্ভব, অন্যদিকে তেমনি সম্ভব অবনতিশীল হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কে উন্নয়ন। সমসাময়িক পত্রিকা আল-এসলাম, ইসলাম প্রচারক, প্রবাসী, প্রচারক, কোহিনুর, সোলতান, মোহাম্মদী, সওগাত, নবযুগ ও নবনূর প্রভৃতিতে সিরাজীর লেখা প্রকাশিত হতো। তাঁর অধিকাংশ লেখাতেই ইসলামি ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও উত্তরাধিকারকে উদ্দীপ্ত করে তোলার প্রয়াস ছিল। তিনি আধুনিক শিক্ষা ও সত্যিকার ইসলামি শিক্ষার পক্ষে বক্তব্য রেখেছিলেন। ইসমাইল হোসেন সিরাজী সিরাজগঞ্জে কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি জমিদার ও মহাজন বিরোধী আন্দোলনে কৃষকদের সংগঠিত করেন। ইসমাইল হোসেন সিরাজীর কাব্যগ্রন্থগুলি হচ্ছে অনল প্রবাহ (১৯০০), আকাংখা (১৯০৬), উচ্ছ্বাস (১৯০৭), উদ্বোধন (১৯০৭), নব উদ্দীপনা (১৯০৭), স্পেন বিজয় কাব্য (১৯১৪), সঙ্গীত সঞ্জীবনী (১৯১৬), প্রেমাঞ্জলি (১৯১৬)। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হচ্ছে রায়নন্দিনী (১৯১৫), তারাবাঈ (১৯১৬), ফিরোজা বেগম (১৯১৮) ও নুরুদ্দীন (১৯১৯) ইত্যাদি।’
সিরাজীর অনল-প্রবাহ কাব্যগ্রন্থটি ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করে এবং তাঁকে দু’বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। স্বাধীনতার জন্য লিখে উপমহাদেশের প্রথম কবি হিসেবে তিনি কারাবন্দী হন।

তুরস্কে ওমর আলী যুদ্ধক্ষেত্রে সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী (১৯১৩)
ইসমাইল হোসেন সিরাজী বক্তা হিসেবে খ্যাতিমান ছিলেন। ছাত্রাবস্থায়ই সিরাজী কবিতা লিখতে শুরু করেন এবং ধর্মবক্তা মুনশী মেহের উল্লাহর এক জনসভায় তাঁর অনল-প্রবাহ কবিতাটি পাঠ করেন। মুনশী মেহেরউল্লাহ কবিতা শুনে মুগ্ধ হন এবং নিজ ব্যয়ে ১৯০০ সালে কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ করেন। ১৯০৮ সালের শেষদিকে বইটির বর্ধিত সংস্করণ প্রকাশিত হয় যা তৎকালীন বাংলা সরকার বাজেয়াপ্ত করে আর তার প্রতি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। সিরাজী তখন ফরাসী-অধিকৃত চন্দননগরে গিয়ে ৮ মাস আত্মগোপন করে থাকেন। পরে আত্মসমর্পণ করলে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ প্রচারের অভিযোগে তাকে দু'বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।

সিরাজী একজন বলকান যোদ্ধা এবং এ বিষয়টি নিয়ে তিনি সারাজীবন গর্ব করেছেন। ১৯১২ সালে বলকান যুদ্ধের সময় ভারতে ডাঃ মোখতার আহমদ আনসারীর নেতৃত্বে ইন্ডিয়ান রেড ক্রিসেন্ট গঠিত হয়। এই সংগঠন একদল চিকিৎসকসহ 'অল ইন্ডিয়া মেডিক্যাল মিশন' প্রেরণ করে। ইসমাইল হোসেন সিরাজী মিশনের বঙ্গীয় প্রতিনিধি হিসেবে তুরস্কে যান। তিনি তুরস্ক ভ্রমণ (১৯১০) গ্রন্থে এই সফরের বিস্তৃত বিবরণ দিয়েছেন।
১৯১৯ সালে সিরাজী মাসিক নূর নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। তাঁর নিজের মহাশিক্ষা মহাকাব্য এবং কাজী নজরুল ইসলামের কয়েকটি গল্প এ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯২৩ সালে সিরাজী ও মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর যুগ্ম সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক ছোলতান। সিরাজীর অধিকাংশ প্রবন্ধই এই পত্রিকায় মুদ্রিত হয়।
সিরাজী বঙ্কিমচন্দ্রের দুর্গেশনন্দিনীর প্রতিক্রিয়ায় তাঁর রায়নন্দিনী লেখেন, রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির প্রতিযোগী হিসেবে লেখেন প্রেমাঞ্জলি-যা তাঁর স্বজাতির প্রতি অকৃত্রিম দরদ ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ এবং তাঁর নীতি ও আদর্শ প্রতিষ্ঠার বলিষ্ঠ ও সাহসী পদক্ষেপ। সিরাজীর সময়োপযোগী এসব লেখা বহুলপঠিত ও পাঠকনন্দিত হয়।
তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থাবলি নিম্নরূপঃ
কাব্যগ্রন্থ
অনল-প্রবাহ (১৯০০), আকাঙ্ক্ষা(১৯০৬), উচ্ছ্বাস (১৯০৭), উদ্বোধন (১৯০৭), নব উদ্দীপনা (১৯০৭), স্পেন বিজয় কাব্য (১৯১৪), মহাশিক্ষা মহাকাব্য (১ম খণ্ড-১৯৬৯, ২য় খণ্ড-১৯৭১)।
উপন্যাস
রায়নন্দিনী (১৯১৫), তারাবাঈ (১৯১৬), ফিরোজা বেগম (১৯১৮), নূরউদ্দীন (১৯১৯), জাহানারা (১৯৩১), বঙ্গ ও বিহার বিজয় (১৮৯৯-অসমাপ্ত), বঙ্কিম দুহিতা।
উল্লেখ্য, বাংলা একাডেমি হতে তাঁর উপন্যাসসমূহ প্রকাশিত হয়েছে।
সঙ্গীত গ্রন্থ
সঙ্গীত সঞ্জীবনী (১৯১৬), প্রেমাঞ্জলি (১৯১৬)।
প্রবন্ধ
স্ত্রীশিক্ষা, স্বজাতি প্রেম (১৯০৯), আদব কায়দা শিক্ষা (১৯১৪), স্পেনীয় মুসলমান সভ্যতা (১৯১৬), সুচিন্তা (১৯১৬),
মহানগরী কর্ডোভা, আত্মবিশ্বাস ও জাতীয় প্রতিষ্ঠা, তুর্কী নারী জীবন (১৯১৩)।
ভ্রমণ কাহিনী
তুরস্ক ভ্রমণ (১৯১০)।
প্রাথমিকভাবে সিরাজী সৈয়দ জামাল উদ্দিন আফগানির প্যান ইসলামিজম সম্পর্কে আগ্রহী ছিলেন। তবে তাঁর প্রায় সমসাময়িক শিবলী নোমানী এবং আল্লামা ইকবালের চেতনা ও আদর্শ দ্বারা তিনি সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হন।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে তিনি ভীষণ স্নেহ করতেন, উৎসাহ জোগাতেন। নজরুলও তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন, তাকে 'পিতা' বলে সম্বোধন করতেন।
সিরাজীর দেশপ্রেমমূলক কবিতা আজও আমাদেরকে উদ্দীপ্ত করে, পথ দেখায়। আশা করি নিচের কবিতাটি থেকে আমরা যথার্থ শিক্ষা নিতে পারব। তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।
জন্মভূমি
সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী
হউক সে মহাজ্ঞানী মহা ধনবান,
অসীম ক্ষমতা তার অতুল সম্মান,
হউক বিভব তার সম সিন্ধু জল
হউক প্রতিভা তার অক্ষুণ্ন উজ্জ্বল
হউক তাহার বাস রম্য হর্ম্য মাঝে
থাকুক সে মণিময় মহামূল্য সাজে
হউক তাহার রূপ চন্দ্রের উপম
হউক বীরেন্দ্র সেই যেন সে রোস্তম
শত শত দাস তার সেবুক চরণ
করুক স্তাবক দল স্তব সংকীর্তন।
কিন্তু যে সাধেনি কভু জন্মভূমি হিত
স্বজাতির সেবা যেবা করেনি কিঞ্চিৎ
জানাও সে নরাধমে জানাও সত্বর,
অতীব ঘৃণিত সেই পাষণ্ড বর্বর।






Comments