হে মহারাজ।। সৈয়দ আহমেদ তাহমিদ
- সৈয়দ আহমেদ তাহমিদ

- Nov 25, 2021
- 4 min read
Annabella, Paranomal activities, It, Dabbe, etc. এসব মুভি দেখেছেন কি? ভূতের মুভি। ভয়ংকর! আমি এখন ভুত। মানুষ থাকতে ভুতের মুভি দেখিনি। এখন না দেখে বিপদে পড়েছি। কি করে কি করতে হয় কিছুই বুঝতে পারছিনা। আচ্ছা, আমি আসলে ভুত কিনা তাই ঠিক বুঝতে পারছিনা। মানুষ যে বলে,
এক পা কবরে এক পা মাটিতে।
আমার বর্তমান অবস্থা বোধহয় সেরকম! চোখে দেখতে পাচ্ছিনা। হাত পা কিছুই নাড়াতে পারছিনা। কানেও শুনছিনা কিছুই। কিন্তু মগজটা কেন জানি এখনো কাজ করছে। অহেতুক আমার জীবনকে দীর্ঘায়িত করে চলেছে হৃৎপিন্ডটা। বিরক্তিকর উপদ্রবের ন্যায় ওটা বুকের পাজরে ধাপ ধুপ করে সজোরে আঘাত করে চলেছে। বোধহয় হাড়গোড় ভেঙে বেরিয়ে পড়তে চায়। কেন চায় আমি বলতে পারবনা। আমি আবার মানবিকের ছাত্র। বিজ্ঞানের বন্ধুদের জিগ্যেস করলে হয়ত বলতে পারবে। জিগ্যেস তো আর করতে পারবনা। আমি ভুত, থুক্কু আধা ভুত হয়ে রাস্তায় পড়ে আছি যে। মাথার খুলি গেছে তিন টুকরো হয়ে। ওদিকে গলগল করে রক্ত বেরুচ্ছে সম্ভবত। ব্যাথা লাগছেনা। কেমন অসস্তিকর লাগছে বিষয়টা। রাস্তার মধ্যে বিব্রতকরভাবে পড়ে আছি। কি একটা অবস্থা! কিভাবে যেন এই অবস্থায় আসলাম মনে আসছেনা। মনে করবার দরকার নেই। বৃথা যন্ত্রণা। তার চেয়ে বরং খুশির কিছু মনে করবার চেষ্টা করি। ভুতের মুভির কথা বলছিলাম। বিচ্ছুগুলো প্রত্যেকটা মুভি দেখতে যেত একসঙ্গে। ভুতের মুভি এই মুভি সেই মুভি। আমি বেচারা বাসায় বসে থাকতাম। আম্মু যেতে দিত না। রাত হয়ে যাবে, পড়ার সময় নষ্ট হবে, অনেক দূরে একা যেতে দেবনা, মুভি দেখা হারাম ইত্যাদি নানা যুক্তিতে আমাকে প্রত্যেকবার ঘরবন্দী হয়ে থাকতে হত। বাদরের দল মুভি দেখত দল বেধে আর পরদিন স্কুলে এসে আমাকে আঁতেল, ঘরকুনো ইত্যাদি নানা নামে ডেকে হেনস্ত করা হতো। একবার সিদ্ধান্ত হলো যে আমার বাসার ছাদে মুভি দেখা হবে। ভুতের মুভি তবে পুরোনো মুভি। পঞ্চাশ কি ষাটের দশকের মুভি। নাম Horror Express. মুভি বেশ ভয়ানকই ছিল বলা চলে। আমার দেখা জীবনের সবচেয়ে ভালো মুভিগুলোর একটি। কিন্তু এইযে বলেছিলাম ভুতের মুভি কখনো দেখিনি। শেষ্পর্যন্ত দেখা গেল Horror Express আসলে ভুতের মুভি না। সেটা একটি সাইন্স ফিকশন। ভীনগ্রহের "Form of energy" পৃথিবীতে লক্ষ্য কোটি বছর ধরে আটকে আছে। ফসিলের মধ্যে সেটি বসবাস করে! পৃথিবীর ইতিহাসের আদ্যপান্ত দেখা এই ফসিলবাসীর! মুভিটা ভুতের না। তবে বেশ ভয়ংকর ছিল। রাসেলটা যে খুব হম্বিতম্বি করেছিল যে সে এগুলো ডরায় না। শেষকালে দেখা গেল মুভির মধ্যিখানে আসবার আগেই সে বেটা নাস্তানাবুদ। আবার এই সাইন্স ফিকশনের অনেককিছুই আমি বুঝলামনা। সেজন্যে সেদিন রাতেও আমাকে হেনস্ত করেছিল সবগুলো মিলে। আহ! কি দিন পার করেছি! বন্ধুদের সঙ্গে থাকলে রাতের আকাশ ওটা আকাশ নয়, চাঁদ তারাদের জমকালো পরিবেশনা মনে হয়। আচ্ছা, এই পরিস্থিতিতে কি করে আসলাম তা কিছুটা মনে পড়ছে। রাস্তা পার হচ্ছিলাম । এরপর কি জানি হলো। ঠিক খেয়াল নেই। অন্যকিছু ভাবি বরং। ওহ, সাইকেল চালানোর ঝোঁক আমার। সেগুলোর স্মৃতি মাথায় আসছে। সাইকেল চালানোর শখ আমার সেই আন্ডাকাল থেকে। প্রথম সাইকেল কিভাবে পেলাম তা মনে আছে। সেই ছয় কি সাত বছর বয়সের কথা। আব্বু আম্মুর সাথে হাটতে বের হয়েছি। দেখি পার্কের মধ্যে বাচ্চারা সাইকেল চালাচ্ছে। আম্মুর হাত টেনে বললাম "আম্মু আম্মু আমাকে ওইটা কিনে দাও। আমার ওইটা লাগবে।" এরপর আর কিছুই মনেনাই। বাসায় এসে সাইকেলের কথা ভুলে গিয়েছি। কয়দিন পর দেখি বাবা পিচ্চি একটা সাইকেল নিয়ে হাজির। বাবা হেটে হেটে অফিস যেতেন। বাসে ধাক্কাধাক্কি সহ্য হতোনা, রিকশাভাড়া দেবার মত পয়সা থাকতনা। তখন বুঝিনি পরে বুঝেছি বাবা ওই সাইকেল ওভাবেই হাতে করে নিয়ে এসেছিলেন দু তিন কিলোমিটার। যাইহোক, এরপর কতকি হলো। সেই সাইকেল চালানো শিখলাম, কিছুদিন পর পেছনের দুই এক চাকা খুলে ওটাকে দিচক্রযান বানানো হলো। আস্তে আস্তে বড় হলাম। মানুষ বলে সময় কত তারাতারি চলে গেল, Time flies. আমার কাছে সময় খুবি আস্তে আস্তে গিয়েছে। আমি সারাদিন খেলাধুলা করেছি, আড্ডা দিয়েছি। আমার সময় কেটেছে ঘটনাবহুল, ধীরগতিতে। আমি খুব ভালো স্কুলে ভর্তি হলাম। আব্বু আম্মু আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন। কেন করলেন কি জানি। আমার মধ্যে কি বা এমন আছে, আর আমি কিই বা এমন করেছি এমন ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য হতে। স্কুল জীবনে খুব একটা দুষ্টু প্রকৃতির ছিলাম না। আমাকে যা বলা হতো করতাম। খেলতাম, আড্ডা দিতাম প্রচুর। কিন্তু অনুমতি সাপেক্ষে। অনেকের মধ্যে একরকম তেজ থাকে। তারুণ্যের উদ্দীপনা, প্রাণচাঞ্চল্য। নতুন কিছু করে দেখাবার আকাঙ্ক্ষা, নিজেকে প্রমাণ করবার জেদ, নিয়ম শৃঙ্খলের বাইরে অভিনব কিছু করে ফেলার স্পৃহা। আমার মধ্যে এসব কিছু নেই, ছিলও না। আমি নিতান্ত ভদ্রলোক। উচ্ছৃঙ্খল কিছু করবার বাসনা আমার মাঝে কোনো আমলেই ছিলনা। রাস্তায় যখন উদ্দেশ্যহীনভাবে সাইকেল নিয়ে ঘুরতে বেরুতাম, মনে হত জীবনে আর কি চাই! একজন লোকের আর কি চাওয়া থাকতে পারে! সাইকেল নিয়ে ঘুরতে যাওয়া থেকে মনে পড়ল। কোথায় জানি যাচ্ছিলাম আমি।

ওহ, আমার কলেজ। কলেজে যাচ্ছিলাম। নটর ডেম কলেজ! চান্স যখন পেলাম আব্বু আম্মুর কি উচ্ছাস! আমার ছেলে নটর ডেমে পড়ে! দেশের সেরা কলেজে পড়ে! আমিও ভাবলাম বিশেষ কিছু হয়ে গিয়েছি। পরে বুঝতে পেরেছি বিশেষ কিছু আসলে হইনি। বিশেষ কিছু হতে পারি দিতে হবে আরো বহু পথ। সে প্রসঙ্গ থাক। বোঝাবোঝির পর্ব শেষ। আমি এখন, এক পা কবরে এক পা মাটিতে! আবার মাথায় ব্যাথা করতে শুরু করছে। কতক্ষন সময় হল এভাবে পড়ে আছি? দশ মিনিট? বিশ মিনিট? আধা ঘন্টা? এক ঘন্টা? কি জানি। হাত পা কিছুই অনুভব করতে পারছিনা। কিন্তু আমি জানি আমি এখনো সেভাবেই পড়ে আছি। এরা আমাকে হাসপাতালে নেয়নি। কেউ বলে দিচ্ছে যে আজ্রাইলের কার্য সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত এভাবেই পড়ে থাকব। কেউই আমাকে নিয়ে হাসপাতালে যাবেনা। তারা বেহুদা শক্তি অপচয় করতে ইচ্ছুক না! নটর ডেমে ভর্তি হবার পর আব্বুকে বললাম কলেজের কাছে বাসা ভাড়া নিতে। আব্বু বলে বাসা ভাড়া ওদিকে প্রচুর। এই নিয়ে ব্যাপক ঝগড়াঝাটি চলছিল বেশ কদিন। গতকাল রাতে বললাম, " টাকা বাচিয়ে কি করবে যদি এতদুর যেতে আসতে গিয়ে রাস্তায় মরে পড়ে থাকি!" ভাবলাম কিছু একটা ঘটলেই আব্বুর টনক নড়বে। উচিত শিক্ষা হবে! এখন ভাবছি এসব কথা বলবার, ভাববার সত্যি কি দরকার ছিল! ভাবাভাবি করে আর লাভ কি। ভাবাভাবির পর্ব শেষ।
মহারাজ তোমার দরবারে চললাম!
এখানে সবাই এসে জড়ো হবে। আমি দু দিন আগে আসলাম। ক্ষতি কি! কে যেন কবে বলেছিল, " যে শালা মারা গেসে তার তো ঝামেলা শেষ। হে এখন চরম শান্তিতে আসে!"






Comments